Posts

Showing posts from November, 2017

একজন লেখকের চোখে রণ-পা

Image
রণ-পা অর্থাৎ দুটো বাঁশের উপরে পা রেখে ভারসাম্য করে দাঁড়িয়ে থাকা বা এগিয়ে চলাকেই আমরা ঐতিহাসিকভাবে রণ-পা হিসাবে চিনি। একসময় যুদ্ধে এই পায়ের ব্যবহার হোত শত্রূকে ঘায়েল করার উদ্দেশ্যে। তখন থেকেই এর নাম হয় রণ-পা। সময়ের সাথে সাথে রণ-পা ক্রমে বাজিকরের খেলায় রূপান্তরিত হল। আর সাম্প্রতিক সময়ে এই খেলাও বিলুপ্তির পথে। একবিংশ শতকের ঢাকায় ঘোড়ার গাড়ীর দেখা মিললেও ধানমন্ডি লেকে রণ-পা আর তার বাজিকরের দেখা পাওয়া অনেকের জন্যই বেশ চমকের ছিল, লেখকের কাছেও তার আকর্ষণ ছিল অনেক। এক বিকেলে, রঙীন আর আকর্ষনীয় সাজে সজ্জিত একজন বয়স্ক মানুষ বেশ করে সিরামিকের ইটের রাস্তা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন আর লোকজন তাকে দেখছে। এই দৃশ্যটা লেখকের চোখে এক অদ্ভত আকর্ষণ তৈরি করেছিল। লেখক বলেন, তিনি কথা বলছেন উচ্চস্বরে, হাত-পা নেড়ে। লেখক বলেছেন, বোকাবাক্স প্রতিনিয়ত যেভাবে ফিয়ার সেক্টর, এমেজিং রেইস, ম্যাজিকস সিক্রেট আরো নানান রিয়েলিটি শো দিয়ে বুঁদ করে রেখেছে তাতে আমার সন্দেহে হচ্ছিল রণ-পার বাজিকর এই  চলমান দর্শকদের কীভাবে মুগ্ধ করবেন বা আদৌ মুগ্ধ করতে পারবেন কিনা, আজকের আয় প্রত্যাশামত হবে কিনা। বাজিকর অবশ্য লেখকের প্রাথমিক অনুমানকে ধু...

রন-পা নৃত্য পরিবেশনে শিল্পী ও স্থান

রণ - পা নাচ হল এক দলবদ্ধ প্রয়াস । একটি সারিতে দাঁড়িয়ে এক পা পিছনে , অন্য পা সামনে ফেলা দেহভঙ্গি থাকে । এই নাচের মুদ্রা শিল্পীরা অনেক সময় বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে কখনও দ্রুত লয়ে , কখনও বা বিলম্বিত লয়ে নাচ পরিবেশন করেন । রণ - পা নাচ করাএ হয় ঢোলের বোলে , গানের তালে । সহযোগী হিসাবে থাকে বাঁশীর সুর । শিল্পীরা সাধারণত রঙীন জামা , ধুতি ও মাথায় বেঁধে নেন রঙীন ফেট্টি । কিছু কিছু নাচে শিল্পীরা রণ-পায়ের উপরের অংশ তাদের হাত দিয়ে ধরে এবং তারই পরিপ্রেক্ষিতে পদক্ষেপ করে। আবার কিছু নাচে রণ-পা গোড়ালির সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয় এবং শিল্পীর হাত মুক্ত থাকে। নাচে মূলত ঢোল, ধামসা ও কাঁসর ঘন্টা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাঁশী ও সানাই সহযোগে নাচ চলে। শিল্পীদের পায়ে থাকে নুপুর। রণ-পা হল একটি গোষ্ঠী নৃত্য যেখানে শিল্পীরা একটি পা পিছনে ফেলে একটি সামনে এগিয়ে দিয়ে বৃওাকারে ঘুরতে নাচ করে। শিল্পীরা অনেক সময় কাঁধের কাছে ঢাল, কোমরবন্ধে তলোয়ার ও হাতে বর্শা নিয়ে যোদ্ধার বেশে নাচে অংশ নিয়ে থাকে। সাধারণত দীর্ঘ সময় ধরে এই নাচ চলতে থাকে, ফলে বেশ থরথর উত্তেজনার পরিবেশ তৈরি হয়। রণং দেহি পরিবেশে যখন এই নৃত্য চলতে থাকে তখন তাকে ঘিরে র...

রণ-পা নৃত্যের আবির্ভাব

লোকনৃত্যের একটি অঙ্গ হল রণ - পা নাচ । তাই এই প্রসঙ্গে আমরা লোকনৃত্যের ধারণাকে তুলে ধরেছি । তবে রণ - পা নাচ অন্য নাচের মত তথাকথিত ভাবে আসে নি । যুদ্ধের পরবর্তী ধারা হিসাবে এটা এসেছে । নাচের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মানুষের অস্তিত্ব রক্ষা তথা জীবন সংগ্রামের কাহিনী । রণ - পা নাচের সঙ্গে যুদ্ধের অনুসঙ্গ থাকলেও তা এক ধরনের উচ্চমার্গীয় নাচ। রণ-পা নাচ রণনৃত্যের এক পরিবর্তিত রূপ। তবে রণনৃত্যের সঙ্গে রণ-পায়ের কোনও সম্পর্ক নেই। বেঁচে থাকার জন্য সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে হত। কৃষিকাজ করে একদিকে যেমন মানুষ নিজের খাদ্য যোগান দিত,তেমনি মানুষ তাদের শ্রমের যন্ত্রণা ভুলতে তাদেরই কাজে ব্যবহৃত লাঠি দিয়ে নৃত্য পরিবেশন করত। যখনই কোনও ক্ষেত্রে দুই গোষ্ঠী বা দুটি উপজাতির মধ্যে কোনও রকম বাধা পেত, তখনই তারা যুদ্ধ বা কোনও সংঘর্ষে লিপ্ত হত । তাদের এই যুদ্ধের ধারণা থেকে পরবর্তী কালে এসেছে রণ-পা নৃত্য। এই নৃত্যের সঙ্গে যেহেতু যুদ্ধের একটা যোগসূত্র আছে, তাই একে আমরা যুদ্ধ নৃত্যও বলতে পারি। এই নৃত্য পরিবেশনে রয়েছে প্রাণ প্রাচুর্য। তবে এই নৃত্য পরিবেশন করতে প্রয়োজন দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষণ ছাড়া এই নৃত্য...

লোকনৃত্যের উত্থান

নাচ বা নৃত্য(Dance) এই শব্দটি এসেছে প্রাচীন ফ্রেঞ্চ শব্দ Dancier থেকে । যা মূলত শারীরিক নড়াচড়ার প্রকাশভঙ্গীকে বোঝায় । এ প্রকাশভঙ্গী সামাজিক , ধর্মীয় বা মনোরঞ্জনের ক্ষেত্রে দেখা যায় । এতে আছে গতি , মুদ্রা , সংযম ও ছন্দ । নৃত্য শিল্পের এমন একটি শাখা , যা খুব সম্ভবত প্রাচীনমতম । প্রাচীন জনপদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের অংশ হিসাবে নাচ প্রচলিত ছিল , তার নিদর্শন পাওয়া যায় । মিশরীয় দেওয়ালচিত্রে ও ভারতীয় গুহাচিত্রে নৃত্যকলার বিভিন্ন ভঙ্গী দেখতে পাওয়া যায়। নাচের ব্যবহার ব্রাজিলীয় সংস্কৃতি থেকে শুরু করে ভারতীয় সংস্কৃতি পর্যন্ত প্রসারিত।          ভারতের সংস্কৃতিতে দুই ধরনের নাচ রয়েছে । এর একটি হল ঐতিহ্যবাহী , অপরটি হল লোকনৃত্য , যা সাধারণ মানুষের জীবনচর্যার পরম্পরায় সম্পৃক্ত । লোকনৃত্য হল এক ধরনের দলবদ্ধ নাচ , যা কোরাস গান ও বাজনার তালে তালে পরিবেশন করা হয় । বাদ্যযন্ত্র হিসাবে ধামসা -মাদল, কাঁসি, ঢোল ও বাঁশী ব্যবহার করা হয়। এ নৃত্য বিশেষ কোনো নরগোষ্ঠী, অঞ্চল বা উপজাতীয় সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে উদ্ভত ও বিকশিত। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ...

রন-পা-র প্রয়োজনীয়তা

ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে রাঢ় বাংলায় অর্থাৎ বর্ধমান , বাঁকুড়া ও মেদনীপুরে লুটেরা ও ডাকাতরা রণ - পা পড়ে ডাকাতি করে খুব দ্রুত এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় পালিয়ে যেতে পারত। মাটির রাস্তা রণ - পা পরে হাঁটার সময় কোনও শব্দ হত না। পুলিশের গ্রেপ্তার এড়াতে ঘন জঙ্গলে ডাকাতরা খুব সহজেই লুকিয়ে পড়তে পারতেন। এরপর আসে ব্র্রিটিশ শাসনে রণ - পা - র ব্যবহার।ভারতে অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতকে ইংরেজরা শাসনকালে কিশোর ও তরুণ বিপ্লবীরা এই রণ - পা - র সাহায্যে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় দীর্ঘ পথ হেঁটে বার্তা পৌঁছে দিতেন। যখন কোনও নেতা ব্রিটিশ পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে আত্মগোপন করে থাকতেন , তখন তাদের গোপন ডেরায় খবর পৌঁছে দেওয়া বা সেই ডেরা থেকে কোনও নির্দেশ বয়ে আনার কাজ করতে বিপ্লবী দলে নাম লেখাত অনেক অল্পবয়সী ছেলেরা। পুলিশের নজর এড়াতে এদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গভীর জঙ্গলের মধ্য দিয়ে যাতায়াত করতে হত। ক্ষুদিরাম বসু যখন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত , তখন তমলুক থেকে মেদিনীপুর সদর পর্যন্ত দীর্ঘ ...

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং রণ-পা-র উপকরণ

অতীতে উত্তর - পূর্ব ভারতে ( অধুনা বাংলাদেশ সীমান্তে ) অনেক ছোটো ছোটো রাজ্য ছিল । এইসব রাজ্যের রাজাদের ছিল নিজস্ব সেনাবাহিনী । গাট্টাগোট্টা চেহারার যুবকরা বাহিনীতে কাজ পেত । এদের বেশীরভাগই আসত ডোম সম্প্রদায় থেকে। সেনাদের দুটি বাহিনীতে ভাগ করা হত, যার একটি ছিল রণ পা। এই বাহিনীর হাতে দেওয়া হত শক্তপোক্ত লম্বা লাঠি। এদের রণ পায়ে দ্রুত হাঁটা এবং রণ পায়ে চেপে লাঠি চালানোর শিক্ষা দেওয়া হত। যুদ্ধের সময় এরা রণপায়ে হেঁটে শত্রূসেনাদের নির্মমভাবে লাঠিপেটা করে ছত্রভঙ্গ করে দিত। রণ পায়ের সুবাদে অন্য সেনাদের চেয়ে অনেক বেশী লম্বা হওয়ায় এরা দূর থেকে শত্রূসেনাদের মোকাবিলা করতে পারত। কাছে ঘেঁষতে না পেরে শত্রূসেনারা রণে ভঙ্গ দিয়ে পালিয়ে যেত।         রণ পার ইতিহাস ঘেঁটে দেখা গেছে, ছত্রপতি শিবাজির সেনাধ্যক্ষ ছিলেন বর্ধমান জেলার কাটোয়া নিবাসী ভাস্কর পন্ডিত। তিনি যুদ্ধের অন্যতম কৌশল হিসাবে রণ পা সেনা ব্যবহার করেছিলেন। উদাহরণ হিসাবে আরও জানা যায়, যুদ্ধ হতে পারে অনুমান করে গৌড়ের রাজা হুসেন শাহ তাঁর রাজ্যের সীমানা বরাবর রণ পা সেনা মোতায়েন করার নির্দেশ সেনাধ্যক্ষকে দিয়েছিল...

রন-পা-র ভূমিকা

রণ-পা হল এক ধরনের উচ্চাঙ্গের নাচ। দুটি আলাদা শব্দ- রণ ও পা-জুড়ে তৈরি হয়েছে রণ পা। এখানে রণ হল যুদ্ধ আর পা হল মানবদেহের সেই অঙ্গ যার উপর ভর করে মানুষ সোজা হয়ে দাঁড়ায়, সামনে-পিছনে হাঁটাচলা করে এবং ছুটে বেড়াতে পারে। রণ-পা হল এক ধরনের কৃত্রিম পা, যা যুদ্ধের সময় যোদ্ধারা নিজের পায়ের সঙ্গে জুড়ে উচ্চতাকে প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়ে নিতে পারে। ঐতিহাসিক নিদর্শন থেকে আমরা জানতে পারি সংস্কৃতির প্রাধান্য নিয়ে আর্য এবং অনার্যদের মধ্যে সংঘাত লেগেই  থাকত। এই দুই সংস্কৃতির মিলনের ভাবনায় প্রচন্ড বাধা আসত, যার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি দেখা যেত যুদ্ধে। এয়োদশ শতকের শেষে এই যুদ্ধ ঘিরে রণ-পা আসে।           স্বাধীনতার আগে এলাকা ছেড়ে দ্রুত পালানোর জন্য স্বদেশিরা রণ পা ব্যবহার করতেন। শুধু পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে গ্রেফতারি এড়াতেই নয়, এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় পালিয়ে গিয়ে লুকিয়ে থাকা বিপ্লবীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজেও রণ পা ব্যবহারের চল ছিল। রণ পা লাগিয়ে ডাকাতি করার অজস্র কাহিনী গ্রাম-গঞ্জে লোক মুখে প্রচলিত রয়েছে। রণ পা পরে ডাকাতরা এলে গ্রামবাসীদের মধ্যে ভয়ের ছাপ দেখা দিত। ...