রন-পা-র প্রয়োজনীয়তা
ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে রাঢ় বাংলায় অর্থাৎ বর্ধমান, বাঁকুড়া ও মেদনীপুরে লুটেরা ও ডাকাতরা রণ-পা পড়ে ডাকাতি করে খুব দ্রুত এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় পালিয়ে যেতে পারত। মাটির রাস্তা রণ-পা পরে হাঁটার সময় কোনও শব্দ হত না। পুলিশের গ্রেপ্তার এড়াতে ঘন জঙ্গলে ডাকাতরা খুব সহজেই লুকিয়ে পড়তে পারতেন। এরপর আসে ব্র্রিটিশ শাসনে রণ-পা-র ব্যবহার।ভারতে অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতকে ইংরেজরা শাসনকালে কিশোর ও তরুণ বিপ্লবীরা এই রণ-পা-র সাহায্যে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় দীর্ঘ পথ হেঁটে বার্তা পৌঁছে দিতেন। যখন কোনও নেতা ব্রিটিশ পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে আত্মগোপন করে থাকতেন, তখন তাদের গোপন ডেরায় খবর পৌঁছে দেওয়া বা সেই ডেরা থেকে কোনও নির্দেশ বয়ে আনার কাজ করতে বিপ্লবী দলে নাম লেখাত অনেক অল্পবয়সী ছেলেরা। পুলিশের নজর এড়াতে এদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গভীর জঙ্গলের মধ্য দিয়ে যাতায়াত করতে হত। ক্ষুদিরাম বসু যখন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত, তখন তমলুক থেকে মেদিনীপুর সদর পর্যন্ত দীর্ঘ পথ রণপায়ে হেঁটে বার্তা আদান-প্রদান করত।
এইভাবে ইংরেজ শাসন থেকে ধীরে ধীরে রণ-পা-র ব্যবহার চালু হতে শুরু করে। ইংরেজ শাসন চলাকালীন বিভিন্ন বিপ্লবীরা এই রণ-পা দিয়েই অনেক জায়গায় খুব সহজেই নিজেদের কাজ হাসিল করার জন্যই হোক আর দেশের স্বার্থরক্ষা করার জন্যই হোক না কেন বিভিন্ন জায়গায় যেতে পারতেন এবং বলা যেতে পারে, তাঁরা শত্রুপক্ষের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য হাতিয়ার হিসাবেও ব্যবহার করত। তবে ধীরে ধীরে ইংরেজ শাসন থেকে মুক্তি পাওয়ার পর এই রণ-পা-র ব্যবহার কমতে থাকে। মানুষ যত উন্নত হচ্ছে, ধীরে ধীরে পুরানো জিনিস হারিয়ে যেতে চলেছে। বর্তমান সভ্যতায় যার আর কোনও অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।এইভাবেই রণ-পা হারিয়ে গেছে।
এর প্রয়োজনীয়তা হারিয়ে গেলেও লোকনৃত্যের একটা পর্যায় হিসাবে রণ-পা নৃত্যকে গ্রহণ করে নিয়েছে গ্রাম বাংলার লোক সংস্কৃতির কিছু উপত্যকা ও সেখানকার মানুষজন। একটা বিশেষ দিনে বা বিশেষ কোনও উৎসবে এর প্রাধান্য দেখা যায়। তবে এর চাহিদা হয়তো কিছুটা কম। গ্রাম বাংলার মানুষকে আনন্দ দেওয়ার তাগিদে, হয়তো রণ-পা জীবন্ত হয়ে আছে।
Comments
Post a Comment