ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং রণ-পা-র উপকরণ

অতীতে উত্তর-পূর্ব ভারতে (অধুনা বাংলাদেশ সীমান্তে) অনেক ছোটো ছোটো রাজ্য ছিল এইসব রাজ্যের রাজাদের ছিল নিজস্ব সেনাবাহিনী গাট্টাগোট্টা চেহারার যুবকরা বাহিনীতে কাজ পেত এদের বেশীরভাগই আসত ডোম সম্প্রদায় থেকে। সেনাদের দুটি বাহিনীতে ভাগ করা হত, যার একটি ছিল রণ পা। এই বাহিনীর হাতে দেওয়া হত শক্তপোক্ত লম্বা লাঠি। এদের রণ পায়ে দ্রুত হাঁটা এবং রণ পায়ে চেপে লাঠি চালানোর শিক্ষা দেওয়া হত। যুদ্ধের সময় এরা রণপায়ে হেঁটে শত্রূসেনাদের নির্মমভাবে লাঠিপেটা করে ছত্রভঙ্গ করে দিত। রণ পায়ের সুবাদে অন্য সেনাদের চেয়ে অনেক বেশী লম্বা হওয়ায় এরা দূর থেকে শত্রূসেনাদের মোকাবিলা করতে পারত। কাছে ঘেঁষতে না পেরে শত্রূসেনারা রণে ভঙ্গ দিয়ে পালিয়ে যেত।
        রণ পার ইতিহাস ঘেঁটে দেখা গেছে, ছত্রপতি শিবাজির সেনাধ্যক্ষ ছিলেন বর্ধমান জেলার কাটোয়া নিবাসী ভাস্কর পন্ডিত। তিনি যুদ্ধের অন্যতম কৌশল হিসাবে রণ পা সেনা ব্যবহার করেছিলেন। উদাহরণ হিসাবে আরও জানা যায়, যুদ্ধ হতে পারে অনুমান করে গৌড়ের রাজা হুসেন শাহ তাঁর রাজ্যের সীমানা বরাবর রণ পা সেনা মোতায়েন করার নির্দেশ সেনাধ্যক্ষকে দিয়েছিলেন।

         গোড়ার দিকে মোটা ও সোজা বাঁশ কেটে রণ পা তৈরি করা হয়। উল্লম্ব ভাবে একটি পেশিবহুল শরীরের ভার বহনে সক্ষম এমন বাঁশই রণ পায়ের জন্য আদর্শ। এর সর্বোচ্চ উচ্চতা হয় এক মানুষ সমান। এর উপর একটি ছোট কাঠের পাটাতন থাকে যেখানে পা রাখার পর দড়ি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হয়। এই যোদ্ধাদের মাথায় থাকত আঁটো-সাঁটো পাগড়ি, গায়ে খাটো কুর্তা, পরণে মালকোচা মারা খাটো ধুতি, আর হাতে থাকত শক্ত বাঁশের তেল মাখানো লাঠি। আর এই লাঠির মধ্যস্থ ফাঁকা স্থানে সীসা ঢালা থাকত। লাঠিটি সরু বেত দিয়ে তিন পাকে বাঁধা থাকত। লাঠি চালানোর সময় এরা মুখে হা-রে-রে শব্দ করত। নিজের উচ্চতার চেয়েও বেশী লম্বা লাঠি নিয়ে যুদ্ধ করার সুযোগ ছাড়াও রণ পায়ের আর একটি বাড়তি সুবিধা ছিল। এর একটি পদক্ষেপ ছিল সাধারণ যোদ্ধাদের প্রায় দশটি পদক্ষেপের সমান। ফলে রণ পা সেনারা খুব সহজেই শত্রূ শিবিরে ঢুকে পড়ে আক্রমণ চালাতে পারত। বর্তমানে এই শ্রেণীর রণ পা কিছুটা দেখা যায় রায়বেঁশে শিল্পীদের মধ্যে।

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

রন-পা নৃত্য পরিবেশনে শিল্পী ও স্থান

লোকনৃত্যের উত্থান