রণ-পা নৃত্যের আবির্ভাব
লোকনৃত্যের একটি অঙ্গ হল রণ-পা নাচ। তাই এই প্রসঙ্গে আমরা লোকনৃত্যের ধারণাকে
তুলে ধরেছি। তবে রণ-পা নাচ অন্য নাচের মত তথাকথিত ভাবে
আসে নি। যুদ্ধের পরবর্তী ধারা হিসাবে এটা এসেছে। নাচের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মানুষের অস্তিত্ব
রক্ষা তথা জীবন সংগ্রামের কাহিনী। রণ-পা নাচের সঙ্গে যুদ্ধের অনুসঙ্গ
থাকলেও তা এক ধরনের উচ্চমার্গীয় নাচ। রণ-পা নাচ রণনৃত্যের এক পরিবর্তিত রূপ। তবে
রণনৃত্যের সঙ্গে রণ-পায়ের কোনও সম্পর্ক নেই। বেঁচে থাকার জন্য সাধারণ মানুষকে
প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে হত। কৃষিকাজ করে একদিকে যেমন মানুষ নিজের খাদ্য যোগান
দিত,তেমনি মানুষ তাদের শ্রমের যন্ত্রণা ভুলতে তাদেরই কাজে ব্যবহৃত লাঠি দিয়ে নৃত্য
পরিবেশন করত। যখনই কোনও ক্ষেত্রে দুই গোষ্ঠী বা দুটি উপজাতির মধ্যে কোনও রকম বাধা
পেত, তখনই তারা যুদ্ধ বা কোনও সংঘর্ষে লিপ্ত হত। তাদের এই যুদ্ধের ধারণা থেকে
পরবর্তী কালে এসেছে রণ-পা নৃত্য। এই নৃত্যের সঙ্গে যেহেতু যুদ্ধের একটা যোগসূত্র
আছে, তাই একে আমরা যুদ্ধ নৃত্যও বলতে পারি। এই নৃত্য পরিবেশনে রয়েছে প্রাণ
প্রাচুর্য। তবে এই নৃত্য পরিবেশন করতে প্রয়োজন দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষণ ছাড়া
এই নৃত্য পরিবেশন করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। যুদ্ধক্ষেত্রে লাঠি ব্যবহার নিয়েই এই
নৃত্য পরিচালনা শুরু হয়েছে। এই নৃত্য মূলত পুরুষদের নাচ। যুদ্ধ নৃত্য বলে এখানে
মহিলারা অংশগ্রহণ করতে পারে না।
নাচ যে
আঙ্গিকেই পরিবেশিত হোক না কেন, দেহ সঞ্চালনের বিভিন্ন মুদ্রায় তার প্রকাশ ঘটে
থাকে। আদীম মানব শিকারে সফল হলে অথবা গোষ্ঠী যুদ্ধে জয়ী হলে নাচের মাধ্যমে তাদের
সম্মিলিত আনন্দ প্রকাশ করত। কোনও দলবদ্ধ পরিবেশে দেহ সঞ্চালনের মাধ্যমে আনন্দ
প্রকাশের ধারা এখনও প্রচলিত। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় খেলায় জিত। তবে একদম প্রথম
দিকে হয়ত লাঠির ব্যবহার ছিল না। ধীরে ধীরে মানুষ উন্নত হতে শিখলে লাঠিকে নিজের
সুবিধামতো ব্যবহার করতে থাকে।
রণ-পা নাচের মধ্যে মহাকাব্যিক
বীরগাথা প্রকাশিত হয়। আমাদের আদিম পূর্ব পুরুষদের একটি গোষ্ঠী যখন অন্য গোষ্ঠীর
বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হতো, তখন তারা যুদ্ধ জয়ের আনন্দ নৃত্যভঙ্গীর মাধ্যমে তুলে
ধরত। রুষ্ট প্রকৃতিকে শান্ত করতেও আগে মানুষ নাচের সাহায্য নিত। যা ছিল একটি উচ্চাঙ্গ
নাচ। এইভাবে যুদ্ধ প্রক্রিয়াটি একটি সময়ে গ্রাম বাংলার মানুষের কাছে অতি পরিচিত হয়ে উঠল রণ-পা নৃত্য হিসাবে।
Comments
Post a Comment